যাত্রী সংকটে অটোরিকশা

নিউজ ডেস্ক,বর্তমানকণ্ঠ ডটকম, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭: অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবা বা রাইড শেয়ারিং চালু হওয়ার পর থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। রাইড শেয়ারিংয়ে সুবিধা বেশি পাওয়ায় যাত্রীরা সিএনজিবিমুখ হতে শুরু করেছেন। নগরীর মধ্যে যে কোনো দূরত্বে যাতায়াতের জন্য তাই এখন আর সিএনজি অটোরিকশার দ্বারস্থ হচ্ছেন না তারা। ফলে এতদিন যে অটোরিকশা চালকরা একচেটিয়াভাবে যাত্রীদের জিম্মি করে বাড়তি ভাড়া গুনতেন তারাই এখন গুনছেন অনিশ্চয়তার প্রহর।
অটোরিকশা চালকরা বলছেন, উবারে একটা ধাক্কা এসেছে, এরপর মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিং সেবাগুলো চালু হওয়ার পর তাদের যাত্রী কমেছে অনেক বেশি। একজন যাত্রী হলে বেশিরভাগ সময় মোটরসাইকেলে চলে যায়। তাছাড়া ঢাকা জেলা ও প্রাইভেট অটোরিকশা চলাচল বেড়ে যাওয়ায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা।
নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও আচরণ দোষের কারণেই অটোরিকশা চালকরা এমন বিপাকে পড়েছেন বলে মনে করছেন সাধারণ যাত্রীরা। এতদিন কোনো ধরনের নিয়মের তোয়াক্কা না করে সিএনজি চালকরা যাত্রীদের ভুগিয়েছেন। অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা চালু হওয়ার পর যাত্রীরা যেন সিএনজি অটোরিকশা চালকদের সে দৌরাত্ম্য থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের দাবি জানিয়েছে সিএনজি অটোরিকশা চালকরা। আগামী ২৭ ও ২৮ নভেম্বর তারা ৪৮ ঘণ্টা ধর্মঘটের ডাকও দিয়েছে। চালকদের এ কর্মসূচি আহ্বানের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ যাত্রীদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।
এ অবস্থার জন্য অটোরিকশা চালকদেরই দুষছেন বিআরটিএ চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমান। তিনি বলেন, তারা (অটোরিকশা চালকরা) যদি মিটারে যায়, যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট দূরত্বে যায় তাহলে যাত্রীরা অটোরিকশায় ঠিকই চড়বে। কিন্তু তারা তো গলাকাটা কাজ করে। এত এত জেল জরিমানা করার পরেও তাদের ঠিক করা যায়নি।
অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য বন্ধে দুই বছর আগে শ্রমিক-মালিকদের সম্মতিতে কিলোমিটার প্রতি ভাড়া ও দৈনিক জমার পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ করে দেয় সরকার। ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ করা হলেও কিছু দিনের মধ্যেই মিটারে যেতে অস্বীকৃতি জানাতে শুরু করেন চালকরা।
সাংবাদিক আনিস আলমগীর সম্প্রতি তার একটি লেখায় বলেছেন, অটোরিকশা চালকের চারপাশে লোহার খাঁচা না থাকলে প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় গণ্ডায় গণ্ডায় সিএনজিওয়ালা পেসেঞ্জারের মার খেতো। লেখক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ঢাকা থেকে ৩ চাক্কার স্লো মুভিং সিএনজি! নামের খাঁচা উচ্ছেদের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হোন!
এরকমই বহু সাধারণ মানুষ সিএনজি চালকদের বিষোদগার করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সাধারণ যে কোনো মানবিক আন্দোলন ও গণদাবির পক্ষে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সাড়া পড়ে যায়। কিন্তু সিএনজি চালকদের এ আন্দোলনের পক্ষে একটি শব্দও কেউ উল্লেখ করেনি কোথাও। এর মধ্য দিয়ে সিএনজি চালকদের ব্যাপারে মানুষের ক্ষোভ অনুমান করা যায় বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
মূলত সাধ্যের মধ্যে নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ যাতায়াতের জন্য বছরখানেক ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবা বা রাইড শেয়ারিং। বিশেষ করে উবারের প্রাইভেট কার সেবা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এছাড়া স্যাম, পাঠাও , ময়ূর, ইজিয়ার, গো টু, গো টেকনোলজিস, আমার রাইড, ইয়েস বাইক, বাহসহ কয়েকটি রাইড শেয়ারিং অ্যাপ বাজারে এসেছে। বেশিরভাগই মোটরসাইকেলভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা। তবে উবারের মতো প্রতিষ্ঠান কার, মাইক্রো সেবাও দিচ্ছে।
রাইড শেয়ারিং সেবা চালু হওয়ার পর থেকে সিএনজি অটোরিকশা চালকদের একচেটিয়া বাজার ভেঙে পড়েছে। তারা যাত্রী হারাতে বসেছে। ফলে অ্যাপস কোম্পানিগুলোর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তারা ধর্মঘটের মতো কর্মসূচি দিচ্ছে। তাদের এই কর্মসূচির পাল্টায় অটোরিকশা বর্জনের আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন অনেকে। সিএনজি অটোরিকশা মালিক-চালকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।
তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মগবাজার এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল সিদ্দিকী বলেন, আমরা তো সিএনজি অটোরিকশাওয়ালাদের কাছে জিম্মি ছিলাম। কোনো উপায় না থাকায় বেশি ভাড়া দিয়ে হলেও তাতে চড়তে হতো। কিন্তু রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলো আসায় আমাদের অনেকগুলো অপশন তৈরি হয়েছে। যখন চাইছি, তখনই চলে আসছে। আর ভাড়াও সাধ্যের নাগালে। এ কারণে এসব সেবা জনপ্রিয় হচ্ছে। পিছিয়ে পড়ছে অটোরিকশা।
অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা ‘পাঠাও’র প্রতিষ্ঠাতা হুসাইন ইলিয়াস বলেন, তাদের ‘ইউজার’ হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন পাঁচ লাখ মানুষ। তবে এখন কতজন আমাদের রাইড শেয়ার করছে, এটা প্রকাশ করা যাবে না।
স্যাম’র চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ কাসেমের কাছেও এ বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, এটা বের করা কঠিন। ব্যবসায়িক গোপনীয়তার কারণে কেউ এটা বলবে না। তবে রাইডের সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন।
অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবা চালু হওয়ার পর আয় একেবারে কমে গেছে বলে জানালেন কয়েকজন অটোরিকশা চালক।
খিলগাঁও এলাকায় অটোরিকশাচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, রাইড শেয়ারিং আসার পর আমরা তো আর খ্যাপ পাই না, পয়সাও পাই না। মোটরসাইকেলে, প্রাইভেটকারেই সব প্যাসেঞ্জার চলে যায়। খুব বেশি ঠেকায় না পড়লে আমাদের নেয় না।
ধর্মঘট কর্মসূচি দিয়ে অটোচালকদের কোনো লাভ হবে না বলে মনে করছেন যাত্রীরা। তারা বলছেন, অটোরিকশা নাগরিক জীবনে অস্বস্তি বা দুর্ভোগের নাম। তাদের মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা মানার কোনো বালাই নেই। তার ওপর অধিকাংশ অটোরিকশা ফিটনেসবিহীন বা মেয়াদ উত্তীর্ণ। যাত্রীরা মনে করেন উবার ও পাঠাও-এর মতো সার্ভিসে তারা সন্তুষ্ট তাহলে তারা কেন সিএনজি ও অটোরিকশা শ্রমিকদের দুর্ব্যবহার সহ্য করে এসব যানবাহনে ভ্রমণ করবেন? অনেক যাত্রীই বলছেন, ধর্মঘট ডেকে গ্রাহক আকৃষ্ট করা যাবে না। বরং শ্রমিক নেতা ও চালকদের উচিত যাত্রীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া।
সিএনজি অটোরিকশাকেও অ্যাপসে আওতায় নিয়ে আসার কথা বলেছেন অনেকে। ইতোমধ্যে উবার-পাঠাওয়ের মতো রাইড শেয়ারিং কোম্পানির অধীনে সিএনজি অটোরিকশাকে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া চালু করতে সিএনজি শ্রমিক ঐক্যপরিষদ ড্রাইভার-মালিকদের স্মার্টফোন ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে।
তবে এক্ষেত্রে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশাগুলোকে আদৌ অ্যাপস কোম্পানিগুলো অন্তর্ভুক্ত করবে কি না সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
জনপ্রিয় হয়ে ওঠা রাইড শেয়ারিং সেবায় যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয় সে ব্যাপারে ‘নীতিমালা’ প্রস্তুত করেছে সরকার। এ ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত ও পরামর্শ পর্যালোচনা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতকৃত নীতিমালা মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে জানা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *