‘এই দেশ আমাকে ভাষা দিয়েছে,স্বাধীনতা দিয়েছে,এই দেশ আমাকে ইলিয়াস কাঞ্চন বানিয়েছে’

নিজস্ব প্রতিবেদক,বর্তমানকণ্ঠ ডটকম,মঙ্গলবার,১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ : ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এক সড়ক দুর্ঘটনায় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী মারা যান। পরে ওই বছর ২৭ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামে একটি সংগঠন গঠন করেন। সেই থেকে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সমাজসেবা করছেন জনপ্রিয় এই চিত্রনায়ক। সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর একুশে পদক পাচ্ছেন তিনি।

সম্প্রতি তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন তার দেয়া সেই সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলোঃ

আপনাকে অভিনন্দন। একুশে পদক পাচ্ছেন। আপনার অনুভূতি জানতে চাই।
মানুষ যেকোনো অর্জনে খুশি হয়। আমিও খুশি হয়েছি। এর সঙ্গে যখন রাষ্ট্রীয় ব্যাপার যুক্ত হয়, তখন এটা বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ছোটবেলা থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি লালন করছি। তখন আশপাশের বাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করে মালা তৈরি করেছি। প্রভাতফেরিতে অংশ নিয়েছি। শহীদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছি। একুশে পদক অর্জন তো নিঃসন্দেহে ভীষণ আনন্দের।

২৪ বছর আগে যখন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তখন এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন?
সমাজসেবার জন্য কখনো পুরস্কার পাব, ভাবতেও পারিনি। আমি শুরু করেছিলাম দায়িত্ব থেকে। আমার স্ত্রী আমাকে ভালোবাসতেন, তিনি দুর্ঘটনায় মারা যান। ভক্তরা আমাকে ভালোবাসেন। এই ভক্তদের জন্য আমি ইলিয়াস কাঞ্চন হয়েছি। প্রতিদিন সারা দেশে অনেক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে একজনকেও যদি সচেতন করতে পারি—সেটাই বড় ব্যাপার। অনেককেই বলতে শুনি, দেশ আমাকে কী দিয়েছে। আমি তাদের বলতে চাই, এই দেশ আমাকে ভাষা দিয়েছে, স্বাধীনতা দিয়েছে, এই দেশ আমাকে ইলিয়াস কাঞ্চন বানিয়েছে। এই দেশ না থাকলে আমি ইলিয়াস কাঞ্চন হতে পারতাম না। এ কারণে আমার দায়িত্ব দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করা।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ সংগঠন থেকে সামনে কী করবেন?
আমরা এখন আমাদের কৌশল বদল করেছি। দেশের অনেক সমস্যা। সরকারেরও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়, তা-ই দেখব। সড়ক দুর্ঘটনা এখন যে পর্যায়ে আছে, তা সচেতনতার মাধ্যমে আরও কীভাবে কমানো যায়, সেই চেষ্টা করব। পাশাপাশি আমার দেশ, দেশের স্বাধীনতা—এসব অক্ষুণ্ন রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাব।

চলচ্চিত্রের জন্য আপনার অঙ্গীকার কী?
চলচ্চিত্রের সবার কাছে অনুরোধ করব, তাঁরা যেন এই পুরস্কারের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হন। সবাই যেন এটাকে চলচ্চিত্র আর চলচ্চিত্রের মানুষদের অর্জন মনে করেন। আমার সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব, চলচ্চিত্রের জন্য কিছু করার চেষ্টা করব। চলচ্চিত্রে এখন যে অবস্থা, এখানে আমার একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। সবাইকে নিয়ে কী করা যায়, সেটা দেখব। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক। আসলে তা ভুল। সবাইকে হিংসা ভুলে যেতে হবে। যারা ভুল করবে, তাদের ভুল ধরিয়ে দিতে হবে। পেছনে কথা বলা বন্ধ করতে হবে।

আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে। তৈরি হচ্ছে ভিন্ন পরিবেশ।
এটা আমিও উপলব্ধি করছি। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব পড়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তা সবাইকে বুঝতে হবে। প্রথম প্রাধান্য দিতে হবে নিজের সংস্কৃতিকে।

সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কী করতে হবে?
আমি বলব, এ ক্ষেত্রে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটা দেশের ভবিষ্যৎ ওই দেশের তরুণ প্রজন্মের ভাবনাচিন্তা আর কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করবে। তাই তাদের সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হবে। বাবা-মা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর শিক্ষকদের বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।

উল্লেখ্য, নিরাপদ সড়কের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক আন্দোলন করে আসছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলার পথে পথে যখন মৃত্যুর মিছিল, তখন জনসচেতনতা বাড়াতে ছুটছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কাজ করছেন যাত্রী/পথচারী/চালকদের সচেতনতা সৃষ্টিতে। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে সড়ককে নিরাপদ করার দাবীতে অনড় ব্যক্তিত্ব, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পথিকৃৎ, বরেণ্য ও জননন্দিত চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন এর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে দেশ বিদেশের লক্ষ-কোটি সাধারণ জনতা। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন আজ দেশের প্রতিটি জেলা উপজেলাতে গড়ে উঠেছে সেই সাথে দেশের বাইরে বিদেশের মাটিটেও রয়েছে নিসচার অনেক শাখা। সকলকে নিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন দেশের দুর্ঘটনারোধ করার লক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন নিঃস্বার্থভাবে। ইলিয়াস কাঞ্চন শুরু থেকে এই পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত নিহতদের স্বজনদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। অনেক পঙ্গু ব্যক্তিকে হুইল চেয়ার, কৃত্রিম পা প্রদানসহ তাদের কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা তিনি নিসচার পক্ষ থেকে করে আসছেন। দেশে শিক্ষিত ও দক্ষ চালক তৈরীতে নিসচার পক্ষথেকে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট চালু করা হয়েছে যেখান থেকে এসএসসি পাশ যুবকরা বিনা খরচে গাড়ি চালনার প্রশিক্ষন নিয়ে থেকেন। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন শুধু নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নিয়ে বসে থাকেননি। সমাজের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে রয়েছে তার যথেষ্ট অবদান। বিভিন্ন সময় তিনি বিভিন্ন যায়গায় সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। ছুটে গেছেন দূর্গত অসহায় মানুষের পাশে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অর্থ নিয়ে। বন্যায় দেশে যখন চারদিকে পানিবন্দি মানুষের আহাজারি তখন ত্রান সামগ্রি নিয়ে তাদের পাশে দাড়িয়েছেন এই মহৎ মানুষটি, শুধু তাই নয়, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত, নির্যাতিত অসহায় বাংলাদেশ টেকনাফ সিমান্তে আশ্রয় নেয়া মুসলিম রোহিঙ্গাদের পাশে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে একে একে দু’বার তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। যার স্বীকৃতিস্বরূপ পেলেন একুশে পদক। অভিনন্দন আপনাকে। কৃতজ্ঞতা সকল নিসচা কর্মীদের প্রতি যাদের অক্লান্ত শ্রম ও মেধায় আজ নিসচাকে মহিরূহতে পরিণত করেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

বর্তমানকণ্ঠ ডটকম

http://www.bartamankantho.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *