| ১৭ই জানুয়ারি, ২০২০ ইং | ৩রা মাঘ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২২শে জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী | শুক্রবার বঙ্গবন্ধুর সেই মশাল নিয়েই চলতে চাই-প্রধানমন্ত্রী – Bartaman Kanho

Bartaman Kanho

বর্তমানকণ্ঠ ডটকম

বঙ্গবন্ধুর সেই মশাল নিয়েই চলতে চাই-প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অন্ধকার সময় কাটিয়ে আমরা আলোর পথে যাত্রা করেছি। মাঝখানে একটা কালো অধ্যায় আমাদের জীবন থেকে চলে গেছে। বাংলাদেশে মাঝখানে যে কালো অধ্যায় গেছে, সে কালো অধ্যায় যেন আর কোনো দিন ফিরে না আসে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্ম না হলে জাতি হিসেবে বাঙালি আত্মপরিচয় পেত না। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ। যে বিজয়ের আলোকবর্তিকা জাতির পিতা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, সে মশাল নিয়েই আমরা আগামী দিনে চলতে চাই। গতকাল বিকালে জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনার সূচনা অনুষ্ঠানে তিনি এ প্রত্যয়ের কথা বলেন। ৪৮ বছর আগের এই দিনে জাতির জনকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘটনাপ্রবাহের প্রতীকী মঞ্চায়ন করা হয় ক্ষণগণনার শুরুর আয়োজনে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। বিজয়ী জাতি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ কখনো মাথা নত করে না, করবেও না। উন্নত জাতি হিসেবে সারা বিশ্বে দেশের মানুষ মাথা উঁচু করে চলছে– এই হোক আজকের দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ২০ বছরের সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। শেখ মুজিবের জম্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হতে পারত না। আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মমর্যাদা অর্জন করতে পারতাম না। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ। শেখ হাসিনা বলেন, ২৫ মার্চ যখন পাকিস্তানি হানাদাররা হামলা শুরু করেছিল ঠিক তখনই জাতির পিতা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয় অর্জন করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানিরা এ বিজয় মেনে নিতে পারেনি। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে যার যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাংলার জনগণ তাঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণের পর ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসন অচল হয়ে পড়েছিল। ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে তিনি যে নির্দেশ দিতেন সে অনুযায়ী দেশ চলত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদাররা আত্মসমর্পণ করে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক চাপে পাকিস্তানিরা বাধ্য হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে। আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারত আমাদের সহায়তা করেছিল। আমাদের শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, অস্ত্র দিয়েছিল। এমনকি যারা জাতিসংঘে আমাদের সমর্থন দিয়েছিলেন আমি তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি।
শেখ হাসিনা বলেন, ৮ জানুয়ারি জাতির পিতা পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পান। সেখান থেকে লন্ডন যান। তারপর দিল্লি হয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন। ১০ জানুয়ারি তিনি বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন। জনগণের প্রতি বাবার গভীর ভালোবাসার কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা বলেন, আমার মনে পড়ে, তিনি কিন্তু বাংলার মাটিতে নেমে আমাদের কথা ভাবেননি, পরিবারের কথা ভাবেননি। তিনি চলে গিয়েছিলেন রেসকোর্স ময়দানে তাঁর প্রিয় জনগণের কাছে। তারপর আমরা তাঁকে পাই। তিনি এ দেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবেসেছেন। চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষ সুন্দর জীবন পাবে। এ প্রেক্ষাপটে কবিগুরুর ‘বঙ্গমাতা’ কবিতার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি’- তারই উত্তর (বঙ্গবন্ধু) দিয়েছিলেন এই ১০ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে। জাতির পিতা বলেছিলেন, কবিগুরু দেখে যান আপনার সাত কোটি মানুষ আজ মানুষ হয়েছে, তারা যুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছে। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে চলার প্রত্যয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ যেন বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত থাকতে পারে, সেই কামনা করে ক্ষণগণনার শুভ সূচনা ঘোষণা করছি।

তার আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জম্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের ক্ষণগণনা (কাউন্টডাউন) শুরু হয়। বিকাল ৫টায় কেন্দ্রীয়ভাবে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে জাতির পিতার জম্মশতবার্ষিকীর লোগো উম্মোচন, ঘড়ি চালুর মধ্য দিয়ে ক্ষণগণনার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও পাবলিক স্থানে একই সঙ্গে ক্ষণগণনা শুরু হয়। জম্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও সদস্যসচিব কামাল নাসের প্রধানমন্ত্রীর হাতে মুজিববর্ষের লোগো তুলে দেন। এ সময় মঞ্চে তাঁর পাশে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আরেক কন্যা শেখ রেহানা, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা উদ্বোধন ঘোষণা করে শেখ হাসিনা বলেন, আজ জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিন। যেদিন তিনি তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছিলেন, সেদিনই তাঁর জম্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠান উদ্যাপনের ক্ষণগণনা ঘোষণা করছি। শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমরা বন্দীদশায় ছিলাম। ১৭ ডিসেম্বর মুক্তি পাই। ওই সময় মানুষের মুখে হাসি দেখি। যারা যুদ্ধে সব হারিয়েছিলেন তারা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন প্রিয় নেতাকে পেয়ে। বাংলার দুঃখী মানুষের কথা বলতে গিয়ে তিনি জীবনটা কারাগারে কাটিয়েছেন। এ দেশের মানুষ যেন অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা পায় এটিই ছিল তাঁর স্বপ্ন। পাকিস্তানের মিলানওয়ালি জেলখানায় তাঁকে আটকে রাখা হয়। সেই জেলখানায় গরমের সময় প্রচ- গরম, শীতের সময় প্রচন্ড শীত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দীর্ঘ নয় মাস তিনি কারাগারে বন্দী ছিলেন। বিমান থেকে বঙ্গবন্ধুর নামার দৃশ্যটি দেখতে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য বিমানবন্দর চত্বরের একপাশে বসার ব্যবস্থাও করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কাউন্টডাউনস্থলে উপস্থিত ছিলেন। একদিকে সাধারণ গ্যালারিতে বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন, অন্যদিকে বিশিষ্টজনদের জন্য আলাদা গ্যালারিতে বসার ব্যবস্থা করা হয়। এ সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, ড. রেহমান সোবহান, সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, কবি নির্মলেন্দু গুণ, শিল্পী হাশেম খান, সংগীতশিল্পী রফিকুল আলম, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিত, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদের অধিকাংশ সদস্যই উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ এমপি উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা : এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। গতকাল সকালে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে রক্ষিত জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের মাধ্যমে এ শ্রদ্ধা জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে দলীয় সভাপতি হিসেবে তিনি কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলের পক্ষ থেকে জাতির পিতার প্রতিকৃতির বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এরপর একে একে আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন সহযেগী সংগঠন- মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, কৃষক লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *