উত্তাল জাবি এখন পুরোই শান্ত

জাবি,বর্তমানকণ্ঠ ডটকম: স্লোগান, পুলিশের গুলি, টিয়ারশেল কোন কিছুর শব্দই নেই এখন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাস এখন পুরোই শান্ত। বৃষ্টি এসে সে স্তব্ধতাকে আরেকটু বাড়িয়ে দিল। যেন পুরো ক্যাম্পস জুড়ে নেমে এসেছে এ এক অন্যরকম শোকের আবহা।

কোথাও নেই আড্ডা, বিভাগুলোতে ঝুলছে তালা। অনেক সংগঠন আজকের প্রথম রোজায় ইফতার পার্টির ব্যবস্থা রেখেছিল, তাও বন্ধ হয়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, কেফেট্যারিয়া চত্ত্বরে প্রতি রোজার মত এবার আর বসবেনা বন্ধুদের ইফতার মেলা। হাহাকার আর শুণ্যতা বিরাজ করছে এখন সবুজের এ রাজধানীতে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রবেশধার গুলো দখল করে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

জানা যায়, গত শুক্রবার সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠে পুরো ক্যাম্পাস। তারপর পরিস্থিতিকে শান্ত করতে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা দেয় প্রশাসন।

এরপর হল ভ্যাকেন্টের নির্দেশে রবিবার (২৮ মে) সকাল থেকেই ক্যাম্পাস ছেড়ে যেতে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। একে একে সব শিক্ষার্থী চলে যায় ক্যাম্পাস ছেড়ে।
 
এর আগে, শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় জরুরি সিন্ডিকেট সভায় সকাল ১০টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়। শাখা ছাত্রলীগ এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে সকাল সাড়ে ১১টায় উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ করলেও সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি প্রশাসন। তবে কিছু দিনের মধ্যে আবাসিক হল খুলে দেয়া হবে বলে ছাত্রলীগকে আশ্বাস দিয়েছে উপাচার্য।

উল্লেখ্য, গত ২৬ মে ভোর ৫টায় জাবি সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে শিক্ষার্থীরা। তারা দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবহেলায় কিছু দিন পর পর এই রাস্তায় শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনা ঘটছে। ওই দিন দুপুর ২টায় পাঁচ দফা দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে। কিন্তু প্রশাসনের আশ্বাসে এবং শাখা ছাত্রলীগের বাধায় ১০ মিনিটের মধ্যে অবরোধ তুলে নেয় শিক্ষার্থীরা।

দাবিগুলো হল- নিহতদের লাশ জানাযার জন্য ক্যাম্পাসে কেন ঢুকতে দেয়া হয়নি প্রশাসনকে তার জবাবদিহিতা করতে হবে, নিহতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং নিহত আরাফাতের দুলাভাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্যতা অনুসারে চাকরি দিতে হবে, যে গাড়িটি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে তাকে চিহ্নিত করে চালকের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, সিএন্ডবি থেকে বিশমাইল পর্যন্ত প্রয়োজনীয় স্পীডব্রেকার, জয় বাংলা গেটে ফুটওভার ব্রিজ এবং একাধিক পুলিশ বক্স দিতে হবে এবং এই এলাকায় গাড়ির গতিসীমা সর্বোচ্চ ৩০ কি: মি: এর মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

পরদিন ২৭ মে সকাল সাড়ে ১১টা থেকে আবারও একই দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সড়ক অবরোধ করার পরপরই শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অবরোধকারীদেরকে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে আন্দোলন করার অনুরোধ জানান।

এ সময় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সাথে অবরোধকারীদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এরপর বেলা ১টার দিকে উপাচার্য শিক্ষার্থীদেরকে তাদের দাবি পূরণের আশ্বাস প্রদান করেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের দাবিসমূহ পূরণের দাবিতে অবরোধ অব্যাহত রাখে। এরপর ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের কাছে মারধরকারীদের বিচার দাবি করে।

এদিকে টানা পাঁচ ঘণ্টা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ যাত্রীরা। প্রশাসনের সাথে দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর রাস্তা থেকে সরে না দাঁড়ানোয় বিকেল ৫টার দিকে এ্যাকশনে যায় আশুলিয়া ও সাভার মডেল থানার দুই শতাধিক পুলিশের দুটি টিম। পুলিশের টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ও লাঠিচার্জে উত্তপ্ত হয়ে উঠে ক্যাম্পাস। এ সময় আন্দোলনকারীরা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।

পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটে ক্যাম্পাসের একজন সাংবাদিক, জাবির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহীনসহ আরও ১০ শিক্ষার্থী আহত হয়। আহতদের সবাইকে সাভারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে রাস্তা থেকে হটিয়ে দিলে সন্ধ্যায় বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসায় ভাঙচুর চালায়। এ সময় শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের হাতাহাতিতে সাত শিক্ষক আহত হয়। এরপর রাত ১২টার দিকে জরুরি সিন্ডিকেটের সভা বসে। সভা শেষে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা, সকাল ১০টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়।

এরপর উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থানকারী ৪২ শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। আন্দোলনকারী আটক শিক্ষার্থীদের নামে সন্ত্রাসী মামলা দায়ের করা হয় বলে নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সিন্ডিকেট সদস্য। এ বিষয়ে  বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক তপন কুমার সাহার কাছে জানতে তিনি গ্রেফতারকৃদের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান। আশুলিয়া থানার ওসি মোহসিনুল কাদিরকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি।

FacebookTwitterDiggStumbleuponRedditLinkedinPinterest
Pin It
এই পাতার আরো খবর -