রাজধানীবাসী পানির দুর্ভোগ চরমে

নিজস্ব প্রতিবেদক,বর্তমানকন্ঠ ডটকম: রাজধানীর ধোলাইপাড় এলাকার বাসিন্দা অনিক হোসেন। চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। গত কয়েকদিন ধরে একটানা অফিসেই গোসল সেরে নিচ্ছেন তিনি। কারণ বাসায় পানি সরবরাহ নেই।

তিনি বলেন,‘গত কয়েক দিন ধরেই আমরা তীব্র পানি সংকটে আছি। গত তিন দিন ধরে বাসায় এক ফোঁটা পানিও পাচ্ছি না। অফিসে গোসল করছি। ওয়াসা অফিসে যোগাযোগ করেছি । কোনও কাজ হচ্ছে না।’

রাজধানীবাসীর এই পানির দুর্ভোগ দীর্ঘদিনের। তবে রুটিন মাফিক যারা পানি পান তারা নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। বেশিরভাগ স্থানে ওয়াসার পানি সরবরাহে রয়েছে গণ্ডগোল। স্যুয়ারেজ লাইনের সঙ্গে পানির লাইন মিলে যাওয়ায় ব্যবহার করতে হচ্ছে দুর্গন্ধযুক্ত পানি। এ পানি ফুটালেও দূর হয় না দুর্গন্ধ । ফলে নগরীর বাসিন্দাদের পানি কিনে খেতে হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার নানা রকম প্রকল্প চালু হলেও সেগুলো অতিরিক্ত ব্যয়বহুল প্রকল্প, যার খরচ শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর মগবাজার, মধুবাগ, নয়াটোলা, চেয়ারম্যান গলি, মীরবাগ, খিলগাঁও, বনশ্রী, সেগুনবাগিচা, যাত্রাবাড়ি এলাকার মিরহাজিরবাগ, ধোলাইপাড়সহ আশপাশের এলাকায় পানির সংকট তীব্র। এছাড়া উত্তরার আশকোনা, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়ও রয়েছে পানির সংকট।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, পানি সংকটে রান্না ও বাসাবাড়ির কাজ করতে পারছেন না তারা। বাইরে থেকে খাবার পানি কিনে খেতে হচ্ছে।  ট্যাঙ্কে যেমন পানি নেই একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে সাপ্লাই লাইনগুলোও শুকিয়ে আছে। ফলে বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি আনতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নারীদের।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পানি বিশেষজ্ঞ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তির অপচয়ের পানি দিয়ে একটি পরিবারের সারা দিনের খরচ চলে। ধনী পরিবারে একবার কমোড ফ্ল্যাশ করলে ১৫ লিটার পানি যায়। এটা অপচয়। সরকার যদি পাঁচ লিটার ক্ষমতার লোডাউন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে, তাহলে পানির অপচয় অনেক কমে যাবে।’

আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটার এইড সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা শহরে সচ্ছল একটি পরিবারে সরবরাহ করা পানির ৪১ শতাংশ ব্যয় হয় গোসলের কাজে। ২২ শতাংশ কমোড ফ্ল্যাশ ও কাপড়চোপড় পরিষ্কারে, ৭ শতাংশ ঘরদোর পরিষ্কারে আর ৪ শতাংশ করে রান্না ও খাওয়ার পানি হিসেবে।

ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে প্রায় দেড় কোটি লোকের বসবাস। দেড় কোটি মানুষের জন্য প্রতিদিন প্রয়োজন হয় ২২৫ কোটি লিটার পানি। এর বিপরীতে ঢাকা ওয়াসা প্রতিদিন উৎপাদন করে ২৪২ কেটি লিটার পানি। হিসেব অনুযায়ী ১৭ কোটি লিটার ওয়াসার পানি উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভিন্ন। প্রতিদিন উদ্বৃত্ত পানি উৎপাদন হলেও সিস্টেম লসের কারণে ৬০ কোটি ৫০ লক্ষ লিটার পানির ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। ২২৫ কোটি লিটার চাহিদার বিপরীতে পানি সরবরাহ হচ্ছে ১৮২ কোটি লিটার। এছাড়া গ্রীষ্মকালে পানির উৎপাদন না বাড়লেও পানির চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩০ কোটি লিটারে। কিন্তু সিস্টেম লসের কারণে উৎপাদিত পানি নগরবাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া যাচ্ছে না।

জানা গেছে, সারা বছরই রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি চলে। তারপরও বৃষ্টি শুরু হলেই যেনো এই খোঁড়াখুঁড়ি বহুগুণে বেড়ে যায়। এতে নাগরিক দুর্ভোগ বাড়ে আরও কয়েকগুণ। পানির পাইপ, স্যুয়ারেজের লাইন, গ্যাস লাইন বসানোর জন্য রাস্তা খোঁড়া হয়। নাজেহাল সেই রাস্তা আর ঠিক করার কোনও দায় থাকে না কারও। দায়সারাভাবে কোনও রকম মাটি ফেলেই কাজ শেষ করে সবাই। এতে করে সাপ্লাইয়ের লাইনগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এতে পানির সরবরাহগুলো বন্ধ থাকার কারণে দুর্ভোগ পোহায় সাধারণ মানুষ।

পানির অপচয় রোধে করণীয়
পানি আমাদের বেঁচে থাকার একটি অন্যতম উপকরণ। পানি ছাড়া দৈনন্দিন জীবন অচল, অথচ এই পানি ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। পানির সমস্যা সমাধানে নিজেদের মিতব্যয়ী হতে হবে।

১ .বাথরুমের ফ্ল্যাশ ব্যবহারে আরো সচেতন হতে হবে।
২. সবজি ও তরকারি ধোয়ার ব্যাপারে হিসেবি হতে হবে।
৩. পানির ব্যবহার শেষে কলের মুখ বন্ধ রাখতে হবে।
৪. বাথরুমের ঝর্নায় গোসল না করে বালতিতে করে গোসল করুন।
৫. বাথরুমের ট্যাপের ফোঁটা ফোঁটা পানি বন্ধে উদ্যোগ নিন।
৬. গাড়ি ধোয়ার সময় হুসপাইপের ব্যবহার বাদ দিয়ে বালতিতে পানি নিয়ে ব্যবহার করুন।
৭. ফুলের বাগানে পাইপ দিয়ে পানি না দিয়ে মগে করে ছিটিয়ে দিন।

ইসলামে সব ক্ষেত্রে অপচয়রোধ ও মিতব্যয়ী হওয়ার তাগিদ রয়েছে। আল্লাহ বলেন- ‘তোমরা খাও, পান কর কিন্তু অপচয় কর না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীকে ভালোবাসেন না। (সূরা আরাফ-৩১)। অপর এক আয়াতে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রিয় নবী (সা.) এক ‘মুদ্দ’ (প্রায় ১ লিটার বা ৭৯৬ মি.লি. সমপরিমাণ) পানি দিয়ে অজু সারতেন বলে হাদিসে পাওয়া যায়।

কেউ যুক্তির খাতিরে বলতে পারেন, মরুভূমি অঞ্চলে পানির সংকট ছিল বলে রাসূল (সা.) অল্প পানিতে অজু সারতেন। কিন্তু প্রবাহমান নদীর পাশে বসে অজু করলেও মাত্রাতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন প্রিয় নবী (সা.)।

FacebookTwitterDiggStumbleuponRedditLinkedinPinterest
Pin It
এই পাতার আরো খবর -