সংসদ ভাঙুন, নির্বাচনে সেনা দিন: ইসিকে নাগরিক সমাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক,বর্তমানকণ্ঠ ডটকম: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু করতে ও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতে অবিলম্বে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া ও নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের তাগিদ দিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

সোমবার (৩১ জুলাই) বেলা ১১টা থেকে নির্বাচন ভবনে ইসির সংলাপে নাগরিক প্রতিনিধিরা তাদের মত তুলে ধরেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে এ বৈঠক শুরু হয়। এতে অন্তত ৩০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।

বৈঠক থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সুশীলরা।

এসময় বৈঠকে অংশ নেয়া সিপিডি সম্মানিত ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘ইসিকে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। তারা যে দৃঢ় এবং স্বাধীন কমিশন এটি জনগণকে বুঝাতে হবে। সেটি মানুষের সামনে দৃশ্যমান করতে হবে এবং তা প্রমাণ করতে হবে। নির্বাচনী আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। প্রশাসন কীভাবে নিরপেক্ষ থাকবে এবং তাদের নিরপেক্ষ রাখতে ইসি কীভাবে ভূমিকা রাখবে তা দেখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘তফসিল ঘোষণার আগে ইসির করার কিছু নেই- এমন বক্তব্যকে আমরা অনেকে গ্রহণ করিনি। এখন থেকে ইসির অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে।’

সিপিডির এই ফেলো আরও বলেন, ‘ধর্মকে নির্বাচনী প্রচারে কোনোভাবেই নেওয়া যাবে না। বড়ভাবে ঐক্যমত হয়েছে- না ভোট চালুর বিষয়ে ব্যাপক ঐক্যমত রয়েছে। সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে রাখতে হবে। পাশাপাশি এ দুটো বিষয়ে ভিন্নমতও এসেছে আলোচনায়।’

নির্বাচনী ব্যয়কে নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও বেশি স্বচ্ছতা-জবাবদিহিত রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে আলাদা আইন করতে হবে বলেও মত দেন তিনি।

দেবপ্রিয় বলেন, ‘নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- ইসির বন্ধু রাজনৈতিক দল
নয়; ইসির বন্ধু হল জনগণ, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া ও আইন-আদালত। সংলাপে নির্বাচনকালীন-নির্বাচনোত্তর সহিংসতা রোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।’

অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘ইসি কোনও ইস্যু রেইজ করেনি; তারা বলতে দিয়েছে। ইসিকে তার ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে হবে, বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘কমিশনকে সক্রিয় হতে হবে। সকল দলকে নির্বাচনে নিয়ে আসতে হবে। সে দায়িত্ব ইসিরই। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে। প্রার্থী, পোলিং এজেন্ট ও ভোটারের মনে যে ভয়ভীতি রয়েছে তা দূর করতে হবে- এটা নিয়ে সংলাপে কারও দ্বিমত ছিল না।’

নিজে পক্ষে থাকলেও সাবেক আমলাদের অনেকে সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর
সংজ্ঞায় না রাখার জন্যও সংলাপে বলেছেন বলে জানান তিনি।

‘সহায়ক সরকার নিয়ে আলোচনা উঠলেও অনেকে পক্ষ-বিপক্ষ নিয়েছেন। সেনাবাহিনী
মোতায়েন, প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো, ভয়ভীতি-শঙ্কা দূর করতে ইসি আসলে কোনও
পদক্ষেপ নেয় কিনা সেটি সবার দেখার বিষয়’- যোগ করেন তিনি।

আসিফ নজরুল আরও বলেন, ‘কেউ কেউ বলেছেন এ নিয়ে ইসির কথা বলা উচিত নয়। আমাদেরও কথা বলা উচিত নয় বলে কেউ কেউ বলেছেন। ইসি চেষ্টা করেছে সবার বক্তব্য শোনার। সবচেয়ে বড় কথা হল- এখন ইসি কী পদক্ষেপ নেয় তা দেখা; এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি বলেন, ‘আগের ইসি তাদের কাজকর্মে ইমেজ সঙ্কটে পড়েছিল। কিন্তু আমরা চাই বর্তমান ইসি ভাবমূর্তি সঙ্কট কাটিয়ে উঠে যাতে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে সে ব্যবস্থা নেবে। তারা যেন রাজনৈতিক দলের কাছে মাথা নত না করে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে
সঠিক দায়িত্ব পালন করে- এটা সবার চাওয়া।’

আসিফ নজরুল জানান, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা যায় কিনা বিবেচনা করার জন্য বলা হয়েছে। যেহেতু ডিসিরা রিটার্নিং অফিসার থাকে, সেক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া যেতে পারে।

সংলাপ শেষে হোসেন জিল্লুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘সবাই খোলামেলা মত দিয়েছেন। অনেক বিষয় মতৈক্যের মত হয়েছে, কিছু বিষয় নিয়ে ভিন্নমত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন নিজে সক্রিয় হওয়া, নিকট অতীতে দেখেছি ইসি নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগে অনীহা দেখিয়েছে। যেটা সুষ্ঠু নির্বাচন অর্জনে কাজে দেয়নি। ইসি নিজে যেন সক্রিয় হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা লিখিত মতামতও দিচ্ছি। রিটার্নিং অফিসারের নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্ব বিষয়। এক্ষেত্রে নিজস্ব লোকও হতে পারে; অথবা ইসির চিহ্নিত জেলা প্রশাসকও হতে পারে। কর্মকর্তা নিয়োগেও ইসিকে সক্রিয় থাকতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইসির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অভিযোগ আমলে নেওয়া হচ্ছে না বা কোনও প্রতিকার নেই। এটাতে সক্ষমতা প্রমাণ হয় না। এ জন্য সক্ষমতা দেখানো জরুরি। অভিযোগ আমলে নিয়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে অনেক অনিয়ম রোধ হত।’

তিন বলেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে ভোটার, প্রার্থী, প্রস্তাবক-সমর্থক, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা ভয়ে থাকে। ভয়মুক্ত নির্বাচন করতে সেনা মোতায়েনের বিষয়টা গুরুত্ব পেয়েছে। তাদের দৃশ্যমাণ গুরুত্ব পেয়েছে। সেনা মোতায়েনের দৃশ্যমান করতে হবে।’

সংলাপে উঠে আসা বিষয়সমূহ তুলে ধরে আসিফ নজরুল বলেন, ‘কোনও নির্বাচন কমিশন এককভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে না। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার ইসির বিষয় না হলেও সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে ইসিকে সহযোগিতা করতে হবে। আর সহায়ক সরকারের বিষয়টি একান্তই রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এটা রাজনৈতিক দলের আলাপ আলোচনা করেই ঠিক করতে হবে।’

তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে সংলাপ হওয়া দরকার। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে বর্তমান সরকার থাকবে নাকি অন্যরা থাকবে সেটিও একটি বিষয়। তবে এ সময়ে সংসদ ভেঙে দেওয়া জরুরি। না হলে ক্ষমতার বলয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ওপর ইসির কর্তৃত্বটা রাখা খুবই জরুরি।’

ইভিএম নিয়ে বিতর্ক হলে সময় বেশি ব্যয় না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সংসদ ভেঙে দিলে সবার জন্যে সমান সুযোগ তৈরি হবে। আর তাতে ভালো নির্বাচনের পরিবেশও তৈরি হবে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা।

সংলাপ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত অলিউর রহমান বলেন, ‘আলোচনায় মূল ফোকাসটা দেওয়া হয়েছে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে। আমরা যেন সবার অংশগ্রহণে ভোট দেখতে পাই। সহায়ক সরকারই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। অনেকে বলেছে তত্ত্বাধায়ক সরকার আনা হোক;  আমরা বলছি-এটা আনা সম্ভব না, এটা ডেড ইস্যু। আর্মি নিয়ে আসার কথা বলা হচ্ছে-
আমরা বলেছি তাদের ম্যাজিস্ট্রেশিয়াল পাওয়ার দেওয়া ঠিক হবে না; আর্মিকে ভোটে আনার দরকার নেই। পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার কথা উঠেছে-আমরা বলেছি এখনই ভেঙে দেওয়া যাবে না।’

ইচ্ছেকৃতভাবে একটি গোষ্ঠী সমালোচিত বিষয়গুলোকে ঘুরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে বলেও জানান তিনি।

সংলাপে অংশ নেয়া অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘ভোটের সময় সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারলেই জনগণ সন্তুষ্ট থাকবে। এক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে হবে।’

তার ভাষ্য, ‘সংলাপে ভোটে সেনা মোতায়েন করার কথা এলেও তাদের ম্যাজিস্ট্রেশিয়াল পাওয়ার দেওয়ার কথা উঠেনি। ইসি সঠিকভাবে কাজ করলে কোনও রাজনৈতিক দলই তাদের পছন্দ করবে না। তবে জনগণকে তারা পাশে পাব।’

অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচন হচ্ছে সুপার পলিটিক্যাল ইভেন্ট। এ নির্বাচনের মাধ্যমে দলগুলো ফল ঘরে তোলে। কিন্তু এখনকার সঙ্কট দূর করে নির্বাচনী কৌশলে আসতে হবে। এবং সেটি যত দ্রুত হবে ততই গণতান্ত্রিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার জন্য মঙ্গল।’

ইসির নির্বাচনী সংলাপে অংশ নেয়া আরেক নাগরিক প্রতিনিধি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘সব দলকে ভোটে আনতে হবে এবং সবার জন্যে সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে আইনে ঘাটতি থাকলে তার ব্যবস্থা নেবেন। নাগরিক প্রতিনিধিরা সঙ্গে থাকবেন।’

আগামীতে ১ কোটি প্রবাসী নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ তৈরিতে ইসিকে পরামর্শ দেন তিনি।

FacebookTwitterDiggStumbleuponRedditLinkedinPinterest
Pin It
এই পাতার আরো খবর -