রোহিঙ্গাদের অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না: রেডক্রস

নিউজ ডেস্ক,বর্তমানকণ্ঠ ডটকম: শুধুমাত্র প্রাণভয়ে যে সব রোহিঙ্গা শরণার্থী মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রসের প্রতিনিধি কোরিন আম্লার।

তিনি বলেন, এসব গৃহহীন মানুষ খালি পায়ে হেঁটে এসে এই কাদার মধ্যে যেভাবে অবস্থান করছেন, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।

তিনি বলেন, ত্রাণবাহী কোনো ট্রাক দেখলে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যেভাবে মরিয়া হয়ে ছুটে আসছেন, তা দেখলেই বোঝা যায়, তাদের কত কষ্ট!

সর্বহারা রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে কোরিন আম্লার বলেন, তাদের খাবার নেই। এক ফোঁটা নিরাপদ পানি নেই পান করার। তাদের কাছে কোনো অর্থ নেই। তাদের কোনো পোশাক নেই।

রেডক্রসের এই প্রতিনিধি অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে এভাবেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করছিলেন।

কোরিন আম্লার আক্ষেপ নিয়ে বলেন, আমি যা দেখেছি, তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। তারা (রোহিঙ্গা) সবাই বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছেন।

তিনি বলেন, প্রতিদিনই হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আসছেন। যখনই কোনো ত্রাণবাহী ট্রাক আসছে, তখনই নারী, শিশু, পুরুষ একটুখানি ত্রাণ হাতে পেতে মরিয়া হয়ে উঠছেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা স্রোতের মতো আসছেন। তাদের থাকার জায়গা নেই। তারপরও তারা আসছেন। তাদের এসব সমস্যা দিনকে দিন আরো গভীর হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ইউনিসেফের মুখপাত্র ম্যারিক্সি মারকাডো বলেন, শরণার্থীদের কষ্ট দিনকে দিন বাড়ছে। তারা অমানবিক অবস্থায় অস্থায়ী ক্যাম্পে দিন পার করছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে যত রোহিঙ্গা শরণার্থী এসেছেন, তাদের অর্ধেকের বেশিই শিশু। তাদের সংখ্যা বর্তমানে দুই লাখ ৪০ হাজার। তাদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর মতো অবস্থা নেই। এর মধ্যে ৩৬ হাজার শিশুর বয়স এক বছর কিংবা তারও নিচে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার করে রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন।

মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাকে জাতিগত নির্মূলের অভিযান বলে অভিহিত করেছে, জাতিসংঘ। সংস্থাটি বলেছে, এই ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকবে।

এদিকে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ২৫ আগস্ট জঙ্গি গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) নিরাপত্তা বাহিনীর আউটপোস্ট হামলা চালানোর পর দেশটির সরকারি বাহিনী রোহিঙ্গা নির্মূলে অভিযান শুরু করে। এরপর স্যাটেলাইট ছবিতে ৮০টি বড় বড় আগুনের ছবি ধরা পড়ে।

এবিষয়ে সংস্থার এক গবেষক ওলফ ব্লগভিস্ট সংবাদমাধ্যমকে বলেন, রাখাইন প্রদেশ আগুনে জ্বলছে। এতে পরিস্কার যে, ওখানে সরকারি বাহিনী জাতিগত নির্মূলের অভিযান চালাচ্ছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গা গ্রাম পোড়ানোর জন্য পেট্রল এবং মশাল ব্যবহার করছে। এরপর যখন গ্রামবাসী ভয়ে যখন পালাতে শুরু করে, তখন তারা গুলি ছোড়ে।

রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়ে যাচ্ছে বলা হলেও কোন এলাকার কোন গ্রাম আগুনে পুড়ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করেনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

২৫ আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে একযোগে ২৩টি পুলিশের এবং একটি সেনাছাউনিতে হামলা চালায়। এসময় নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে গুলি বিনিময়ে শতাধিক লোক প্রাণ হারান। এর মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ জন সদস্যও রয়েছেন। এরপর সরকারি বাহিনী রাখাইন প্রদেশে সহিংসতা শুরুর করলে চারশজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। তারপর শুধুমাত্র প্রাণ বাঁচাতে তিন লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। প্রতিদিনই এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে।

এত শরণার্থীর জরুরি সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক সংস্থা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।

বুধবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের জরুরি বৈঠকে সরকারি বাহিনীর সহিংসতা বন্ধের জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

এদিকে, বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন, মিয়ানমারের গণতন্ত্রের নাভিশ্বাস উঠেছে।

FacebookTwitterDiggStumbleuponRedditLinkedinPinterest
Pin It
এই পাতার আরো খবর -