‘আমাগো ভাঙা ঘরে ঈদ নেই’

লালমনিরহাট,বর্তমানকণ্ঠ ডটকম: ‘বন্যায় আমাগো ঘর-বাড়ি ভেঙে গেছে। এখনো মাটিতেই পড়ে আছে সেই ঘর। ত্রাণের যে চাল পাই তা দিয়ে কোন রকমে বেঁচে আছি। তাই আমাগো ভাঙা ঘরে ঈদ নেই বাবা!’

শুক্রবার (০১ সেপ্টেম্বর) সকালে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তালেব মোড় এলাকার ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা জরিনা বেওয়া। শুধু ওই বৃদ্ধা নন, গেল বন্যায় লালমনিরহাট জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজনের মাঝে এবারের ঈদের আনন্দেও লেশ মাত্র নেই। তাদের মাঝে আছে শুধু সব হারোনের বেদনা আর হাহাকার।

ওই গ্রামের দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া ফুলেরা আক্তার জানায়, প্রতি বছর ঈদে নতুন জামা-কাপড় পড়ে সে। কিন্তু এ বছর সেই জামা-কাপড় তো দূরের কথা, ঈদের দিন একমুঠো ভাত জুটবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট এলাকার বুমকা এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত রহিমা বেওয়া (৮০) জানান, প্রতি বছর ঈদুল আযহায় তারা বাড়িতে গরু কোরবানি দিতেন। সংসারের কোন কিছুরই অভাব ছিলনা তাদের। কিন্তু বন্যায় সবকিছু হারিয়ে এখন তারা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। তাই এ বছর যেমন তাদের পশু কোরবানি দেয়া হবে না। তেমনি ঈদের দিন কি খাবেন তারও কোন ব্যবস্থা নেই বলে জানান তিনি।

একই কথা বলেন হাতীবান্ধার মধ্য গড্ডিমারী এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত আঞ্জুয়ারা বেগম। তার ভাষ্য মতে, স্বামী আর তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে বেশ ভালোই দিন কাটছিল তাদের। কিন্তু হঠাৎ বন্যা এসে তাদের সাজানো-গোছানো সংসার তছনছ করে দিয়েছে। বাড়ি-ঘর ভেঙে গেছে। তাই ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন তিনি। তাই এবারের ঈদের আনন্দ তাদের মাটি হয়ে গেছে বলে জানান গৃহবধূ আঞ্জুয়ারা।

জানা যায়, গেল ১৩ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় তিস্তা-ধরলা আর সানিয়াজান নদীর পানিতে সবকিছু ভেসে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন লালমনিরহাটের অসংখ্য পরিবার। এরমধ্যে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, সদর ও আদিতমারী উপজেলায় সব থেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব এলাকার বহু পরিবারকে বাড়ি-ঘর হারিয়ে থাকতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। আর সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণের চাল, চিড়া ও গুড় খেয়ে কোন রকমে বেচেঁ থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা। তাই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহার দিনে তারা কি খাবেন, কি পড়বেন এমন দুশ্চিন্তাই তাড়া করছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে।

সরকারি হিসেবে গেল বন্যায় লালমনিরহাট জেলার ৫টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নে বন্যায় এক লাখ ২ হাজার ৭৫০টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে সেই পানি নেমে গেলেও ভেসে উঠেছে বন্যার ক্ষত। কৃষকরা একদিকে বাড়ি-ঘর হারানোর পাশাপাশি ফসল হারিয়েছেন। তেমনি হাজার হাজার পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ায় নিঃস্ব অনেকেই।

তাদেরই একজন হাতীবান্ধার একটি মৎস খামারের লিজ গ্রহীতা ময়েজ উদ্দিন বলেন, ‘এবারেব বান মোর মাছের খামারটা ভাসিয়া নিয়া গেইছে। ধার দেনা করি প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ করচুনু (করেছিলাম)। এ্যালা সেই টাকা শোধ করবার পাংছে (পাচ্ছি) না। এর উপর আবার ঈদ আসছে। এখন বউ-বাচ্চাকে নিয়ে কি খামো (খাবো)? কিভাবে সংসার চালাবো? তার কোন কুলকিনার পাইছে না!’ তবে এমন সমস্যায় শুধু ময়েজ উদ্দিনই নয়, সম্প্রতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মৎস চাষীদের অনেকেরই ঘরে এবার ঈদের আনন্দ নেই বলে জানা গেছে।

লালমনিরহাট জেলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রেজাউল করিমের ভাষ্য মতে, ভয়াবহ বন্যায় সাত হাজার ৭০২টি পুকুরের এক হাজার ১৭৪ মেট্রিকটন মাছ ভেসে গেছে। এতে প্রায় ১০ কোটি ৫৭ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, বন্যার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে রোপা আমান ধানসহ হাজার হাজার হেক্টরের ফসলি ক্ষেত। ফলে দুশ্চিন্তার শেষ নেই কৃষকদের। অগামি দিনে তার কিভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন তারও কোন উপয় খুঁজে পাচ্ছেন না।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বিধু ভূষণ রায় জানান, জেলায় ৩১ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন তলিয়ে গেছে। ১৮ হাজার হেক্টর রোপা আমনের পানি নেমে গেলেও এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার হেক্টর জমির ক্ষেত পানির নিচে রয়েছে। এসব জমির ক্ষেতে কিছুটা ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক (ডিসি) শফিউল আরীফ জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে খাদ্য শস্য বিতরণ অব্যাহত আছে। ঈদের আগে তাদের মাঝে ভিজিএফ চাল বিতরণ করা হবে। তবে সরকারের পাশাপাশি এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজনের পাশে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

FacebookTwitterDiggStumbleuponRedditLinkedinPinterest
Pin It
এই পাতার আরো খবর -