চির নিদ্রায় কিংবদন্তি আব্দুল জব্বার

নিউজ ডেস্ক,বর্তমানকণ্ঠ ডটকম: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সবুজ চত্বরে পানি জমে গেছে। আকাশ কালো করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। কিন্তু তা শহীদ মিনারমুখী মানুষের স্রোতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। মানুষ এসেছে কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।

বিদায় দাও গো বন্ধু তোমরা এবার দাও বিদায়/

মায়ের ছেলে মায়ের কোলে ফিরে যেতে চায়।

শেষ বিদায়ের দিনে নিজের গাওয়া গান যেন ফিরে এলো শহীদ মিনারে। সবার কাছে বিদায় নিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় গেলেন আব্দুল জব্বার। সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে যখন আব্দুল জব্বারের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন মাইকে বেজে উঠলো ফজল-এ-খোদার কথায় আব্দুল জব্বারের সেই গান—

সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহীদ স্মরণে/

আমার হূদয় রেখে যেতে চাই তাদের স্মৃতির চরণে।

গতকাল বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন এবং তার কর্মস্থল আগারগাঁওয়ের বেতার ভবন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দুই দফা জানাজা শেষে বিকালে তাকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। বুধবার সকাল নয়টা ১০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান এ শব্দসৈনিক।

গতকাল সকাল ১১টার দিকে অঝোর বৃষ্টির মাঝে তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় এ নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠানে প্রিয় শিল্পীকে বিদায় জানাতে ছুটে আসেন হাজার হাজার মানুষ। এখানে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়া আকরাম ইবনে সাজ্জাদের নেতৃত্বে গার্ড অব অনার প্রদান করে আব্দুল জব্বারের মরদেহ জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত করা হয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সবার শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার দ্বিতীয় জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের কবরের জন্য নির্ধারিত স্থানে সমাহিত করা হয় একাত্তরের এই কণ্ঠযোদ্ধাকে।

শহীদ মিনারে প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তার মুখ্যসচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী। আওয়ামী লীগের পক্ষে দলটির সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শ্রদ্ধা জানান। ব্যক্তিগত পর্যায়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী মির্জা আজম, জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আক্তার, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শব্দসৈনিক সৈয়দ হাসান ইমাম, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, চিত্রনায়ক উজ্জ্বল, শিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন, সংসদ সদস্য কবি কাজী রোজী, ম হামিদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরউল্লাহ চৌধুরী, কুদ্দুছ বয়াতি আশরাফুল আলম, শাহীন সামাদ, নমিতা ঘোষ, কল্যাণী ঘোষ, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, বুলবুল মহলানবীশ, মনোরঞ্জন ঘোষাল, শিল্পী তপন চৌধুরী, গীতিকার কবির বকুল প্রমুখ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিভিন্ন সংগঠন-প্রতিষ্ঠানের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, জাসদ, জাসদ ছাত্রলীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ছাত্রমৈত্রী, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, জাসাস, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল, বাংলাদেশ  টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় গণগ্রন্থাগার, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থা, উদীচী। এর আগে সকালে প্রথমে তার মরদেহ নেওয়া হয় বেতার ভবনে। সেখানে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। যাতে অংশ নেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের পাশাপাশি বেতারের কর্মকর্তা ও কলাকুশলীরা। জানাজা শেষে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, তথ্যসচিব মরতুজা আহমদ, বেতারের মহাপরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদ, বিসিএস তথ্য-সাধারণ বেতার কল্যাণ সমিতি, বাংলাদেশ বেতারের নিজস্ব শিল্পীসংস্থা, রেডিও অ্যানাউনসার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করা হয়।

বিশিষ্টজনদের স্মৃতিকথায় আব্দুল জব্বার

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আব্দুল জব্বার ছিলেন বাংলা গানের সুরের জাদুকর। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, আমাদের আত্মার আত্মীয়।’ আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে আমরা “মিউজিয়াম অব মিউজিক” প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি। সেটির মাধ্যমে আমরা আব্দুল জব্বারের সংগীতকে সংরক্ষণ করবো।’ হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘আব্দুল জব্বারের কাজ সংরক্ষণ করার জন্য বেতার, ডিএফপিসহ সরকারি দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘সংগীতে তিনি অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। আমাদের দেশে নায়কের বড্ড অভাব। আমি আশা করবো, তরুণ প্রজন্ম আব্দুল জব্বারকে নায়কের আসনে রেখে এগিয়ে যাবে।’ আশরাফুল আলম বলেন, ‘ছয় দফা ঘোষণার পর যে সকল গণআন্দোলন সংঘটিত হয়েছে, তার প্রতিটিতেই আব্দুল জব্বার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন। তিনি দেশকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন।’ গাজী মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের একনিষ্ঠ সৈনিক ছিলেন আব্দুল জব্বার। একাত্তরে আমার লেখা ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন আব্দুল জব্বার।

FacebookTwitterDiggStumbleuponRedditLinkedinPinterest
Pin It
এই পাতার আরো খবর -