লোকমানের হত্যাকারীর সঙ্গে স্ত্রীর ফোনালাপ নিয়ে শহর জুড়ে তোলপাড়

লক্ষন বর্মন,নরসিংদী থেকে,বর্তমানকন্ঠ ডটকম: সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নরসিংদীর প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের স্ত্রী তামান্না নুসরাত বুবলী ও হত্যা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত দুবাইয়ে পলাতক আসামী মোবারক হোসেন মোবার ফোনালাপের অডিও ফাঁস হয়েছে। নরসিংদী শহরজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়া এই ফোনালাপে লোকমান পরিবারের অনেক অভ্যান্তরীন ঘটনাবলী প্রকাশ হয়ে পড়েছে। বুবলীর আবেগঘন কথাবার্তায় তাঁর প্রতি মেয়র কামরুজ্জামান কামরুলের নির্যাতন, বঞ্চনা ও লোকমানের মা ও ভাই বোনদের প্রতি তাঁর ক্ষোভের বিষয়গুলো জনসম্মুখে প্রকাশ পেয়েছে।
সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত নরসিংদীর সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা লোকমান হোসেনের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীর আগ মুহুর্তে গত বৃহস্পতিবার থেকে গত রবিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ধারাবাহিকভাবে মোবারক-বুবলীর গোপন ফোনালাপের অডিও প্রকাশ করা হয়। লোকমান হত্যা মামলার একমাত্র পলাতক আসামী শহর আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ মোবারক হোসেন মোবা তাঁর নিজস্ব ফেসবুক আইডি ‘মোবারক সংগ্রাম পরিষদ বাংলাদেশ’ এর মাধ্যমে ফোনালাপের ৪টি অডিও প্রকাশ করেছে।
ফোনালাপে বুবলী আসামী মোবারককে হাজারী ফকির ভাই হিসেবে সম্ভোধন করেন। জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক রেহানুল ইসলাম ভূঞা লেলিন টেলি কনফারেন্সের মাধ্যমে তাদের ফোনালাপের মধ্যস্ততা করে।
ফোনালাপে বুবলী বলেছে, ‘যারা সরল মানুষ তারাই বেশি বিপদে পড়ে।’ বুবলীর এই ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে আসামী মোবারক বুবলীকে মেয়র কামরুজ্জামান কামরুলের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রস্তুতি গ্রহণ করার অনুরোধ জানিয়েছে। মোবারক বলেছে, ‘বুবলী হলেন তাদের মূল পূজিঁ/স্তম্ভ। ওই স্তম্ভ যদি ছুটে যায় মেয়র কামরুল তথা তার পরিবার বানের পানিতে ভেসে যাবে।’
আসামী মোবারক নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে বুবলীর মুখ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হলেও বুবলী বলেন, ‘আপনি জড়িত না থাকলেও মামলায় আসামী করে আপনাদেরকে মেয়র কামরুল যেভাবে পঁচিয়ে দিয়েছে তাতে আপনি আর নরসিংদীতে আসতে পারবেন না।’ আসামী মোবারক বুবলীকে জিজ্ঞেস করেছে কামরুলের সাথে মেয়র লোকমানের সম্পর্ক ভাল ছিল কি না ? প্রত্যুত্তরে বুবলী বলেছে ‘না’।
লোকমানের সম্পদ সম্পর্কে বুবলী বলেছে, ‘আমার জামাই মারা গেছে, আজকে আমার এই অবস্থা কেন ? ওনার টাকা-পয়সা কোথায় গেলো ? কার কাছে ছিল ওনার টাকা ? আজকে আমি মানুষের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। কারও হাতের তলে দিয়ে পড়বো, আর আমি টুপাইয়া খামু। এটা কেন ? আমি মেয়রের (লোকমানের) কথা বার্তায় এতটুকু বুঝতে পারছি, ওনার টাকা-পয়সা তারেকের কাছে ছিল। প্রচুর টাকা আত্মসাৎ করেছে তারেক।’
তিনি বলেন, ‘মেয়র কামরুলের স্ত্রী গাড়ী চড়ে মার্কেটে যায়। আর আমি রিক্সায় চড়ে মার্কেটে, লাইব্রেরী ও স্কুলে যাই। সে আমাকে একটি রি-কন্ডিশন গাড়ীও কিনে দেয়নি।’
বুবলী মেয়র কামরুলের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘যে লোকটা চেয়ারে বইছে সে কিন্তু সব সময় আমাকে সন্দেহের মধ্যে রাখে। তাঁর ধারণা, লোহাকে দিয়ে লোহা কাটার জন্য মানুষ প্রস্তুত। তাঁর একটাই ধারণা, একমাত্র তাঁর প্রতিপক্ষ হিসেবে যদি আমাকে দাঁড় করায় তাহলে সে ব্যানিশ।’
বুবলী নির্বাচনের পরই বাড়ির সকলের চেহারা পাল্টে গেছে গেছে জানিয়ে বলেন, ‘তাঁরা ছেলে-মেয়েকে রেখে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। কোন মা-তো ছেলে-মেয়েকে ছাড়া ভাল থাকতে পারেনা। তাই আমি রাজি হই নি। প্রয়োজনে আমার স্বামীর সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকে ফিস ডিপোজিট করে দেয়ার অনুরোধ করি। কিন্তু আমার প্রয়োজন গুলো তাদের কাছে নগণ্য। এখন আমি আলাদা রান্না করে খাই। তাঁরা আমাকে হাত খরচ দেয়না। আমি ছেলে-মেয়ে নিয়ে কিভাবে চলি ?’
বুবলী লোকমানের মা ও ভাই-বোনদের ভূমিকার সমালোচনা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিজের দুঃখের কথা জানাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে স্বাক্ষাতের জন্য আসামী মোবারকের সহযোগীতা কামনা করেন।
আসামী মোবারক বলেছে, ‘আমি জানতাম লোকমানকে হত্যা করা হবে। আমি এ কথা লোকমানকে বলেছিও। লোকমান বিএনপির সাবেক মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঞাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে।’
বুবলী বলেছে, ‘জীবদ্দশায় লোকমান প্রায়ই বলতো আপনি (মোবারক) নাকি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওনাকে মেরে ফেলার হুমকি দিতেন ?’
আসামী মোবারক বলেন, ‘আমি লোকমানকে হত্যা করিনি। লোকমানের সন্তানদের জন্য সম্ভাব্য যা কিছু করার আমি সবই করবো।’
বুবলী বলেন, ‘মহিলা এমপির ফলাফল বের হওয়ার আগেই গেইম খেলার জন্য আমাকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়ন ক্রয় করায়। তাদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, উপজেলা নির্বাচনে ফেল করিয়ে আমার কোমড় ভেঙ্গে ঘড়ে ফেলে রাখা। সামনে মেয়র নির্বাচনে আমার নাম না আসে।’
তিনি বলেন, ‘আমাকে উপজেলা নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে তারা আমার কাছ থেকে অনেক টাকা খুইয়ে নিয়ে গেছে। আমার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়ে লোকমানের বড় বউয়ের সন্তানকে দিয়েছে। আজ আমাকে টাকার জন্য হাত পাততে হয়।’
এক পর্যায়ে বুবলী বলেন, ‘অনেক সহ্য করেছি, হয় প্রতিবাদ করে বাঁচবো, নয়তো নিজের গায়ে নিজে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যা করবো।’
মোবারক মেয়র কামরুলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এরা কাগজের বাঘ। অর্থ ও সম্পদ নিয়ে খেলে। তাঁরা পুরো নরসিংদী শহরকে ধ্বংস করছে। সকল মাস্তান ও মাদক ব্যবসায়ী এখন তাঁদের নিয়ন্ত্রণে।’
বুবলী জানায়, ‘মেয়র কামরুল পদ পাওয়ার জন্য আহমদকে (কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন) টাকা দিয়েছেন।’
বুবলী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘তাঁরা যদি মনে করতো ওনি (বুবলী) আমাদের সোভাগ্যের প্রতীক, ওনি আমাদের ঘরের লক্ষী, চেয়ারের লক্ষী, অস্তিত্বের লক্ষী। ব্যবহার ও ভালবাসা দিয়ে আমাকে আগলে রাখতো, তাহলে আজ আমার মনে এই ক্ষোভের জন্ম হতো না।’
ফেসবুকে ফোনালাপের অডিও ফাঁস হওয়ার পর বিষয়টি শহরজুড়ে টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে। বেশীরভাগ মানুষই আসামী মোবার সঙ্গে বুবলীর ফোনালাপকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছেনা। এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে মেয়র লোকমান হোসেনের পরিবার। এ কারণেই প্রতি বছর মেয়র লোকমান হোসেনের মৃত্যুবার্ষিকীতে পৌর কবরস্থানে সমাধিসৌধে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বুবলী শ্রর্দ্ধাঘ্য অপর্ণ করলেও এবার দেখা যায়নি। সর্বশেষ বুবলী তাঁর ফেসবুক এ্যাকাউন্টে পোষ্ট দিয়ে ফোনালাপের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
বুবলী লিখেছেন, আমার ভূল বা অন্যায় আমার পরিবার যে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে নিয়েছে আমি গর্বিত। ইতিহাসের পাতায় আছে শত্রু কখনো মিএ হয়না, তারা নীল নকশা ও সামনে মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভেদ সৃষ্টি করে যা করতে চেয়েছে যদি আপনারা আন্তরিক ভাবে আমাকে মাফ করেন তবে লোকমান সৈনিকরা এক হয়ে কুচক্রী মহলের বিরুদ্ধে লড়বো। আমাদের পারিবারিক সম্পর্কের মাঝে কেউ ফাটল ধরাতে পারবে না।
এই ব্যাপারে জানতে চাইলে মেয়র লোকমান হত্যা মামলার বাদী নিহতের ছোট ভাই নরসিংদী পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি কামরুজ্জামান কামরুল বলেন,
প্রসঙ্গত, হত্যাকান্ডের দীর্ঘ ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকান্ডের বিচারকাজ শুরু হয়নি। ফিরিয়ে আনা হয়নি দুবাই প্রবাসী একমাত্র পলাতক আসামী সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেন মোবাকে। আসামী মোবারক দুবাই বসে মোবারক সংগ্রাম পরিষদ বাংলাদেশ এর ব্যানারে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছেন। বিভিন্ন সময় দেশের প্রখ্যাত ব্যক্তিদের সাথে ছবি তোলে এবং বিভিন্ন স্ট্যাটার্স দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করছে। সর্বশেষ চমক সৃষ্টি করেছেন নিহত লোকমান হোসেনের স্ত্রী তামান্না নুসরাত বুবলীর সাথে একাধিক বার কথোপকথনের রেকর্ড ফেসবুকে পোস্ট করে।


FacebookTwitterDiggStumbleuponRedditLinkedinPinterest
Pin It