নীরব-নিস্তব্ধ ‘ফিরোজা’ বাসভবন
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের ফিরোজা বাসভবন নীরব নিস্তব্ধ হয়ে আছে। এই বাড়িতেই থাকতেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ঢাকা সেনানিবাসে শহিদ মইনুল সড়কে সেনাপ্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমানের বাসাটি একমাত্র ঠিকানা ছিল খালেদা জিয়ার। কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতা আসার পর এই বাসা থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করা হয়। এরপর খালেদা জিয়ার জন্য গুলশানের ‘ফিরোজা’ বাসভবন করা হয়।
২০১৮ সালে এই বাসা থেকে পুরনো ঢাকার আদালতে গিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা রায়ে সরাসরি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। করোনা প্রাদুর্ভাবের সময়ে শেখ হাসিনার সরকার বিশেষ শর্তে সাময়িক মুক্তি দিলে হাসপাতাল থেকে ফিরোজাতেই উঠেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ফিরোজার নিরাপত্তা কর্মীরা এখনও পাহারা দিচ্ছেন বাড়িটি। প্রহরী ছাউনি রয়েছে ঠিক আগের মতই। ফিরোজায় দায়িত্বপালনরত নিরাপত্তার কর্মীরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেছে। তাদের চোখে-মুখে শোকের ছায়া ফুটে উঠেছে।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের অনেক স্মৃতি এই বাসায় লেগে আছে, যারা বাড়ির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তাদের আবেগ-অনুভূতিও রয়েছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছে যারা দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময়ে বিশেষ করে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্যারের ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবনে ভালোবাসার পরশ নিয়ে এখনও আছেন ফিরোজার চারপাশে। চেয়ারপারসনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমিও সেই অনুভূতিটা উপলব্ধি করছি যা ভাষায় প্রকাশ করার মানসিকতা এই মুহূর্তে আমার নেই। সত্যিই এই বাসা যেন ম্যাডামকে এখন দেখি জীবন্ত ম্যাডাম হিসেবে ।
বিএনপি চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ) এর একজন সদস্য বলেন, ম্যাডামের ডিউটি করতাম। আজকে ম্যাডাম নেই, পুরো বাড়িটাই খালি। বাড়ির ভেতরে ঢুকলে কেমন জানি একটা শূন্যতা, কেমন জানি একটা নিস্তব্ধতা কানে আসে। এই কষ্ট ও বেদনার কথার বলার ভাষা নেই। দোয়া করি, আল্লাহ যেন ম্যাডামকে ভালো রাখেন পরপারে।
আরেক নিরাপত্তা কর্মী বলেন, ম্যাডাম সব সময় আমাদের খোঁজ-খবর রাখতেন। বিকাল অথবা দুপুরে খবর নিতেন আমরা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছি কিনা।
ফিরোজার পাশের লাগোয়া বাসাটি হচ্ছে ১৯৬ নং বাসা। এই বাসায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বসবাস করেন। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পরে খালেদা জিয়ার নামে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকার বরাদ্দ দিয়েছিল। এই বাড়িটির দলিলসহ কাগজপত্র বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ফিরোজায় এসে খালেদা জিয়ার কাছে হস্তান্তর করেছিলেন কয়েক মাস আগে। সেই বাসাটিতে উঠেছেন তারেক রহমান। সেই বাসার সামনে নিরাপত্তা কর্মীরা যারা দায়িত্বরত তাদের মধ্যেও শোকের ছায়া দেখা গেছে। গুলশান অ্যাভিনিউ ডিপ্লোমেটিক জোনের মধ্য পড়ায় সেখানে নেতা-কর্মীদের ভিড় সেভাবে নেই।
মায়ের চলে যাওয়ার শোকে আচ্ছন্ন তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সারাদিন মায়ের জন্য দোয়া-দরুদ ও নামাজ আদায় করেছেন। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে বাসা থেকে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আসেন।
গুলশানের বাসিন্দা হাসানুজ্জামান খান বলেন, এই কাছাকাছি থাকি। ম্যাডাম নেই, এখন ভরসার জায়গাটা তারেক রহমান। সেইজন্য এখানে এসে কিছু শোকের সঙ্গি হচ্ছি। জানি লিডারের এই শোক শুধু তার একার শোক নয়, এটা আমাদের সবার শোক, এটা আমাদের গণতন্ত্র প্রিয় বাংলাদেশিদের শোক।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন বলেন, আত্মীয় স্বজনরা অনেক বাসায় এসেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সান্ত্বনা জানাতে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে পারিবারিক পরিমণ্ডলে ম্যাডামের স্মৃতিময় ঘটনার কথা বলেছেন তারা। এসময় তিনি আবেগতাড়িত হয়েছেন, শোকাচ্ছন্ন হয়েছেন তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন স্বজনরা।
গুলশান ও নয়াপল্টন কার্যালয়ে কালো পতাকা উড়ছে। বিএনপির পতাকা এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হয়েছে। গুলশানে শোক বই খোলা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, রাজনীতিবিদরা আসছেন তাদের শোক জানাতে।
বৃহস্পতিবার সমাজ কল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, শ্রীলঙ্কার হাইকমিশনার, ছারছীনা দরবার শরীফের পীর মওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি, জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সভাপতি মাহবুবুর রহমানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার ভোরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বুধবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার নামাজে জানাজার পর দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে।







