মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২৭ অপরাহ্ন

সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম চলে ভাড়ার বাসায়

মোঃ মোছাদ্দেক হাওলাদার, বরিশাল । / ২৬ পাঠক
মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২৭ অপরাহ্ন

বরিশাল বিভাগ প্রতিষ্ঠার ২৮ বছর পরও বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা হয়নি। এমনকি নিজস্ব স্থাপনা না থাকায় ভাড়া বাসায় চলছে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রম। নিজস্ব স্থাপনা ও আবাসন-সংকটের কারণে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। বিশেষ করে প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের এ সমস্যা প্রকট।

সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সূত্রমতে, বরিশাল নগরীতে ভাড়া বাসায় চলছে মেট্রোপলিটন পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, পরিসংখ্যান অফিস, বিভাগীয় তথ্য অফিস, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরসহ প্রায় ২০টি সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কার্যক্রম।

তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল নগরীতে অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও বিভিন্ন সংস্থার জেলা কার্যালয় রয়েছে প্রায় ১০০টি। বিভিন্ন দপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয় রয়েছে অর্ধশতাধিক।

বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়ের এসব সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। তবে এই বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ৩০০টির মতো সরকারি বাসা বা ফ্ল্যাট রয়েছে যার ২৫০টিই বসবাসের অনুপযোগী।

প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, নগরীতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বিশেষ করে মাঠ প্রশাসন ও পুলিশ সদস্যদের আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। বিভাগ প্রতিষ্ঠার ২৮ বছর পেরিয়ে গেলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নেই বললেই চলে। উল্টো বিভাগ হওয়ার কারণে সরকারি-বেসরকারি অনেক বিভাগীয় কার্যালয় চালু হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সেই তুলনায় আবাসনের সুযোগ খুবই সীমিত। বরিশাল নগরীতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। বাসা পাওয়ার যোগ্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ৮ সহস্রাধিক। কিন্তু সরকারি বাসা পেয়েছেন মাত্র ৭০-৮০ জন কর্মকর্তা । বিভাগীয় শহর হওয়ার কারণে একটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বেড়েছে শহরের লোকসংখ্যাও। বরিশাল ছাড়া বিভাগের অন্য জেলাগুলোতে তেমন একটা ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকার কারণে অনেক অভিভাবক এখানে বাসা ভাড়া নিয়ে সন্তানের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছেন। এসব কারণে বাড়ি ভাড়াও আগের চেয়ে এখন প্রায় দ্বিগুণ।

ফলে সরকারি কর্মকর্তারা বেতনের সঙ্গে যে টাকা বাড়িভাড়া হিসেবে পান তা দিয়ে তাদের সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী বাসা পাওয়া কষ্টসাধ্য। তথ্যমতে,বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে একজন অতিরিক্তি সচিব (বিভাগীয় কমিশনার), একজন যুগ্ম সচিব (অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার), দুইজন সিনিয়র সহকারী সচিব (সিনিয়র সহকারী কমিশনার) ও পাঁচ জন সহকারী সচিব (সহকারী কমিশনার) পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে বিভাগীয় কমিশনার ছাড়া আর কোনো কর্মকর্তার জন্য সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা নেই। বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও সহকারী কমিশনার মিলিয়ে ২২ জন প্রশাসনের ক্যাডার রয়েছেন। তাদের মধ্যে জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ছাড়া অন্য কর্মকর্তাদের সরকারি কোয়ার্টারের ব্যবস্থা নেই। বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালত, বিভিন্ন ট্রাইব্যুনাল, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মিলিয়ে বর্তমানে বিচারকের সংখ্যা ৪৬ জন। তবে আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ১৩ জনের।

প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তারা বলেন, মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তাছাড়া গত ১৮ জুলাই বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এর সরকারি বাসভবনে হামলার ঘটনায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

তারা আরও বলেন, ঝুঁকি বিবেচনা করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। কর্মস্থল থেকে ফিরে কর্মকর্তা- কর্মচারীরা যেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ একটি জায়গায় থাকতে পারেন সে বিষয়ে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ।

অপরদিকে, ২০০৯ সালে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা দুই সহস্রাধিক। মেট্রোপলিটন পুলিশের অধীনে ৪টি থানা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি থানার কার্যক্রম ভাড়া বাসায় চলছে। শুধু তাই নয়, ভাড়া বাসায় চলছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তরসহ বেশিরভাগ ইউনিটের কার্যক্রম। নেই আলাদা পুলিশ লাইন্স। সদস্যদের জেলা পুলিশ লাইন্সের ব্যারাকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। কোতয়ালি মডেল থানা কম্পাউন্ডে রয়েছে মাত্র ৬টি কোয়ার্টার। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ৪ শতাধিক কর্মকর্তাদের ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে।

তবে মোট্রোপলিটন পুলিশের জন্য নগরীর রূপাতলী এলাকায় পুলিশ লাইন্স নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। সেখানে পুলিশ সদস্যদের পরিবার নিয়ে থাকার জন্য বেশকিছু ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। আশা করছি এরপর আবাসন সংকট অনেকাংশে দূর হবে।

এছাড়াও আবাসন সংকটের কারণে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বেশিরভাগ চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মচারীকে থাকতে হচ্ছে ভাড়া বাসায়।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম জানান, হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে বর্তমানে চিকিৎসকের সংখ্যা ২৩৩ জন। সরকারি বাসার সংখ্যা মাত্র ৩৯টি। হাসপাতালে তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংখ্যা ১১৬ জন। স্বাধীনতার আগে নির্মিত কর্মচারীদের অধিকাংশ বাসা বসবাসের অনুপযোগী। সেকারণে তাদের ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তর বরিশাল কার্যালয়ের তথ্যমতে, ৮২টি সরকারি কোয়ার্টারের মধ্যে ৭৯টি খালি রয়েছে। কারণ সেগুলো বসবাসের অনুপযোগী। এসব বিষয়ে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জেরাল্ড অলিভার গুডা জানান, বরিশাল নগরীতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সুবিধা অপ্রতুল। আবার অনেক সরকারি কার্যালয়ের নিজস্ব ভবন নেই। নগরীতে এ ধরনের ১৮টি দপ্তরের কার্যালয় নির্মাণে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও এর অধীন বিভিন্ন দপ্তর বা সংস্থার জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পরবর্তীতে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সমস্যার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *