সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ১০:১৬ পূর্বাহ্ন

চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চিঠির অপেক্ষায় বাংলাদেশ

ডেস্ক রিপোর্ট | বর্তমানকণ্ঠ ডটকম: / ২৩ পাঠক
প্রকাশকাল সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা বৈশ্বিক ‘পারস্পরিক শুল্ক’ আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করে তা বাতিলের রায় দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। গত শুক্রবার যুগান্তকারী রায়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, ১৯৭৭ সালের যে আইন দেখিয়ে ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে শুল্ক আরোপ করেছেন, সেটি তাকে এই ক্ষমতা দেয়নি। সেই ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের। তবে রায়ে বিক্ষুব্ধ ট্রাম্প বিকল্প পদক্ষেপ নিতে বিন্দুমাত্র দেরি করেননি; ভিন্ন আইনে দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। নতুন এই শুল্ক আরোপের ফলে আগের চুক্তি অকার্যকর হয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ। তবে বিষয়টি নিয়ে আগ বাড়িয়ে উদ্যোগ নেবে না সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়ার পর পদক্ষেপ নেবে।

এই বিষয়ে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান গতকাল রোববার জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি শুল্কসংক্রান্ত চুক্তি হয়েছিল। তবে সেই চুক্তি কার্যকর হওয়ার জন্য উভয় পক্ষের আনুষ্ঠানিক অবহিতকরণ প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সেই অবহিতকরণ দেয়নি। একইভাবে বাংলাদেশও এ বিষয়ে নতুন করে কোনো কাজ করছে না। তারা একটি চিঠি দেবে। সেই চিঠিতে তারা কী বলে, তা আগে দেখতে চাই। এরপরই আমরা প্রতিক্রিয়া জানাব।’

এই রায়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, জাতীয় জরুরি অবস্থার অজুহাতে ব্যাপক বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন করা নির্বাহী বিভাগের একক এখতিয়ারের বিষয় নয়। রায়ের পরপরই ট্রাম্প আদালতের কড়া সমালোচনা করেন এবং কয়েকজন বিচারপতিকে ‘দুর্বল’ ও ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেন। নতুন করে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ধারা ১২২-এর অধীনে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক বার্তায় তিনি শুল্কহার বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেন। তবে আইন অনুযায়ী, এই শুল্ক সর্বোচ্চ প্রায় পাঁচ মাস পর্যন্ত বলবৎ রাখা যাবে। এরপর তা বহাল রাখতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে।

চলতি মাসে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এখন ১৫ শতাংশ শুল্ক কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পূর্ববর্তী শুল্কচুক্তি সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর কার্যত বাতিল হয়ে গেছে। ফলে এখন নতুন করে যে শুল্ক আরোপ হয়েছে, সেটিই কার্যকর বাস্তবতা।’ তার মতে, আগের চুক্তিতে বাংলাদেশের কিছু অসুবিধা ছিল। সেটি বাতিল হওয়ায় বাংলাদেশ কিছুটা স্বস্তি পেলেও ভবিষ্যতে নতুন চুক্তি করতে গেলে বাংলাদেশকে কিছুটা কৌশলগতভাবে পিছিয়ে থেকে দর কষাকষি করতে হতে পারে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়, সেটি এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের কয়েক দিন আগে তড়িঘড়ি করে ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) নামের ঢাকা-ওয়াশিংটন বাণিজ্য চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের পারস্পরিক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামায় যুক্তরাষ্ট্র। দুই পক্ষেই কিছু সুবিধা থাকলেও ‘আমেরিকার স্বার্থরক্ষা’ করে চু্ক্তিটি বাংলাদেশের জন্য ‘কঠোর’ করা হয়েছে ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা বলে আসছেন। চুক্তিটি আবার পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। এদিকে মার্কিন আদালতের রায়ের পর প্রতিবেশী ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা স্থগিত করেছে। গতকাল বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কী জানায় তা স্পষ্ট হওয়া। দ্বিতীয়ত, পূর্বের চুক্তি বাতিলের প্রেক্ষাপটে নতুন দর কষাকষির সুযোগ ও ঝুঁকি নিরূপণ করা। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক শুল্কযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখা।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে। পরে দর কষাকষি করে তা ২০ শতাংশ নামে যা ১ আগস্ট কার্যকর হয়। আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যে ছিল ১৫ শতাংশ শুল্ক; সব মিলিয়ে শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ। বাড়তি এ শুল্ক কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার টানা নয় মাসের বেশি সময় ধরে আলোচনা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। সমঝোতায় পৌঁছাতে মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়ায় বাংলাদেশ। বোয়িং, গম, সয়াবিন, তেলসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়াতে দেয় প্রতিশ্রুতি।

দেনদরবারের মধ্যে গত ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে আরোপিত পারস্পরিক সম্পূরক শুল্ক ১ শতাংশ পয়েন্ট কমে হয় ১৯ শতাংশ। তাতে করে মোট শুল্কহার আগের কমে হয় ৩৪ শতাংশ। নতুন চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ছাড় দেবে; কিন্তু বিনিময়ে তাদের পণ্য আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজারে তাদের আরও বড় ছাড় দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হয় অন্তর্বর্তী সরকারকে।

চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ আগামী ৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা) এবং ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের এলএনজি আমদানির প্রতিশ্রুতি দেয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ১৪টি বোয়িং কেনার সম্মতিও দেওয়া হয়।

পোলট্রি শিল্পে নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলছেন দেশি উদ্যোক্তারা। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাংস, পোলট্রি, প্রক্রিয়াজাত মাংস, সিলুরিফর্মেস (ক্যাটফিশ জাতীয় মাছ) এবং ডিমের মতো পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কোনো বাধা তৈরি না করার সমঝোতায় সই করায়। একই সঙ্গে চুক্তিতে মার্কিন দুগ্ধ-নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের দুগ্ধ-নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমান স্তরে দেখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য ছাপিয়ে এতে রাজনৈতিক উপাদানও যুক্ত হয় নতুন আরেকটি শর্তে। এ শর্তে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ অন্য দেশ থেকে কী আমদানি করবে বা করবে না সেক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দেখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি পণ্যের শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে ৭ হাজার ১৩২টি ট্যারিফ লাইন বা এইচএস কোডে মার্কিন পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৯২২টি ট্যারিফ লাইনের পণ্য চুক্তি সইয়ের দিন হতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। ১ হাজার ৫৩৮টি ট্যারিফ লাইনের পণ্যের শুল্কহার ৫ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে এবং ৬৭২টির শুল্কহার ১০ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ শুল্ক ছাড়ে দেখা যাবে বাংলাদেশে একচেটিয়াভাবে বড় হতে থাকবে মার্কিন পণ্যের বাজার। কারণ দেশটির পণ্য তৈরির সক্ষমতা বেশি, বৈচিত্র্যও বেশি। উল্টোদিকে বাংলাদেশের মূল লাভ হচ্ছে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক যদি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা সিনথেটিক সুতা দিয়ে তৈরি হয়, তবে সেটিতে সম্পূরক শুল্ক ১৯ এর বদলে শূন্য হবে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের একক প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র।

গোপনীয়তায় সঙ্গে করা সম্পাদিত চুক্তিকে সফলতা হিসেবে তুলে ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তা তৈরি পোশাক খাতের জন্য লাভবান হওয়ার কথা বলে আসলেও এ খাতের রপ্তানিকারকরা বলছেন ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে দেশটির বাজারে পোশাক রপ্তানিতে শূন্য শুল্কের কথা অন্তর্বর্তী সরকার বললেও ছাড় মিলবে মূলত অতিরিক্ত আরোপ করা সম্পূরক শুল্কে। সেখানেও রয়েছে নানা শর্ত। রপ্তানিকারকরা বলছেন, কোনো পোশাক পণ্য তৈরিতে তুলার পরিমাণ কত শতাংশ হতে হবে, কতখানি ছাড় পাওয়া যাবে সেটি ছিল অস্পষ্ট।

ওই চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ক্ষতির শঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন পোলট্রি শিল্পের উদ্যোক্তারা। তারা ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার হুমকিতে পড়তে পারেন বলেও দাবি করেছেন কেউ কেউ। এতে খাদ্য নিরাপত্তাও পড়তে পারে হুমকির মুখে বলে শঙ্কা তাদের।


এই ক্যাটাগরির আরো খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর